নবী মুহাম্মদ (স.)-এর ইন্তেকাল সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস
নবী মুহাম্মদ (স.)-এর ইন্তেকাল সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস
পৃথিবীতে প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এই চিরন্তন সত্য থেকে বাদ যাননি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী মুহাম্মদ (স.)। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং সহীহ হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ও স্বয়ং রাসূল (স.) তাঁর ইন্তেকাল ও মরণশীলতার বিষয়টি উম্মতকে স্পষ্ট করে গিয়েছেন।
১. কুরআনের আলোকে নবী (স.)-এর ইন্তেকাল
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নবীজি (স.)-কে লক্ষ্য করে এবং উম্মতকে সচেতন করতে বেশ কিছু আয়াত নাযিল করেছেন।
ক) সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩০
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ অনুবাদ: "নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল এবং তারাও অবশ্যই মরণশীল।"রেফারেন্স: সূরা আয-যুমার (৩৯): ৩০
খ) সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪৪
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ অনুবাদ: "আর মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর আগেও অনেক রাসূল চলে গেছেন। সুতরাং তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন, তবে কি তোমরা তোমাদের হিল (পেছনের দিকে) ফিরে যাবে?"রেফারেন্স: সূরা আল-ইমরান (৩): ১৪৪
গ) সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৪
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِّن قَبْلِكَ الْخُلْدَ ۖ أَفَإِن مِّتَّ فَهُمُ الْخَالِدُونَ অনুবাদ: "আপনার আগেও আমি কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন (অমরত্ব) দান করিনি। সুতরাং আপনার যদি মৃত্যু হয়, তবে কি তারা চিরকাল বেঁচে থাকবে?"রেফারেন্স: সূরা আল-আম্বিয়া (২১): ৩৪
২. সহীহ হাদীসের আলোকে রাসূল (স.)-এর ইন্তেকাল
রাসূলুল্লাহ (স.)-এর অন্তিম মুহূর্ত এবং তাঁর ওফাত সম্পর্কে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো হযরত আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর ঘোষণা:
রাসূল (স.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবীদের শোকাতুর অবস্থায় হযরত আবু বকর (রা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন:
"তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (স.)-এর ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো যে, মুহাম্মাদ (স.) ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, তারা জেনে রাখো যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।"
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ১২৪১
নবীজি (স.)-এর শেষ বাণী:
মা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ইন্তেকালের সময় নবীজি (স.)-এর শেষ কথা ছিল:
اللَّهُمَّ الرَّفِيقَ الأَعْلَى অনুবাদ: "হে আল্লাহ! আমি মহান বন্ধুর (জান্নাতের উচ্চ মাকাম) সাথী হতে চাই।"রেফারেন্স: সহীহ বুখারী: ৪৪৬৩, মুসলিম: ২৪৪৪
এছাড়াও মৃত্যুর সাধারণ নিয়ম ও নবীজি (স.)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, পৃথিবীর কোনো প্রাণীর জন্যই অমরত্ব নেই। এটি একটি চিরন্তন নিয়ম যা নবী মুহাম্মদ (স.)-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
ঘ) সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৫
كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ ٱلْمَوْتِ ۗ অনুবাদ: "প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।"সহজ ব্যাখ্যা: এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সৃষ্টির সেরা মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নবীজি (সা.)-কে এই মানবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
৪. নবীজি (স.)-এর শেষ মুহূর্তের কিছু হৃদয়স্পর্শী হাদিস
রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের সময়কার কিছু ঘটনা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা ও আবেগের বিষয়।
ক) মৃত্যুর যন্ত্রণা সম্পর্কে সচেতনতা:
মা আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (স.) ইন্তেকালের আগে একটি পাত্রের পানিতে হাত ভিজিয়ে মুখ মুছছিলেন এবং বলছিলেন:
"নিশ্চয়ই মৃত্যুর বড় যন্ত্রণা বা কষ্ট রয়েছে।" (সহীহ বুখারী: ৪৪৪৯)
সহজ ব্যাখ্যা: নবীজি (স.) নিজেও মৃত্যুর কষ্ট অনুভব করেছিলেন যাতে উম্মত বুঝতে পারে মৃত্যু কতটা বাস্তব এবং এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া কতটা জরুরি।
খ) খয়বরের বিষক্রিয়ার প্রভাব:
ইন্তেকালের আগে তিনি আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন যে, খয়বরের যুদ্ধে তাকে যে বিষ দেওয়া হয়েছিল, তার প্রভাব তিনি তখনও অনুভব করছিলেন। (সহীহ বুখারী: ৪৪২৮)
সহজ ব্যাখ্যা: এটি নির্দেশ করে যে, নবীজি (স.) একজন মানুষের মতোই বাহ্যিক কারণে অসুস্থ হয়েছিলেন এবং শারীরিক কষ্ট সহ্য করেছিলেন।
গ) প্রিয়তমা স্ত্রীর কোলে শেষ নিঃশ্বাস:
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবীজি (স.) তাঁর থুতনি ও বুকের মাঝখানে মাথা রেখে ইন্তেকাল করেন। (সহীহ বুখারী: ৪৪৪০)
সহজ ব্যাখ্যা: এটি নবীজি (স.)-এর পারিবারিক ভালোবাসা এবং শান্তিপূর্ণ বিদায়ের একটি সুন্দর উদাহরণ।
উপসংহার ও শিক্ষা
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এটি স্পষ্ট যে, নবী মুহাম্মদ (স.) একজন মানুষ হিসেবে দুনিয়ার নিয়ম অনুযায়ী ইন্তেকাল করেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা প্রমাণ করেছেন যে, উপাসনা বা ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। নবীজি (স.)-এর ইন্তেকাল আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, আদর্শ ও দ্বীন কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত সত্য হিসেবে টিকে থাকবে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন