সূরা আল-কালামের ১০-১৩ আয়াত: উগ্র কাফেরের ৯টি চরিত্র ও আলেমদের গালি দেওয়ার বিধান
সূরা আল-কালামের ১০-১৩ নম্বর আয়াত: উগ্র ইসলামের শত্রুর ৯টি কুৎসিত চরিত্র এবং আলেমদের গালি দেওয়ার ভুল মাসআলা
ইসলামের প্রথম যুগে মক্কার কাফেররা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতকে বাধাগ্রস্ত করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও চরিত্রহননের অপচেষ্টা চালাত। তাদের এই অপপ্রচারের জবাবে এবং মুমিনদের সতর্ক করতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কিছু আয়াত নাজিল করেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি স্থান হলো সূরা আল-কালামের ১০ থেকে ১৩ নম্বর আয়াত।
সূরা আল-কালামের ১০-১৩ নম্বর আয়াতের অনুবাদ
আল্লাহ তাআলা নবী (স.)-কে সম্বোধন করে বলেন:
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِين (10) ১০. "আর আপনি অনুসরণ করবেন না এমন প্রত্যেক ব্যক্তির, যে অধিক কসম খায় এবং যে লাঞ্ছিত (তুচ্ছ)।"
هَمَّازٍ مَّشَّاءٍ بِنَمِيمٍ (11) ১১. "যে পেছনে নিন্দা করে এবং একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়।"
مَّنَّاعٍ لِّلْخَيْرِ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ (12) ১২. "যে ভালো কাজে বাধা দেয়, সীমালঙ্ঘনকারী ও পাপিষ্ঠ।"
عُتُلِّ بَعْدَ ذَٰلِكَ زَنِيمٍ (13) ১৩. "কঠোর স্বভাব, তדוপরি সে জারজ (কুখ্যাত/অবৈধ সন্তান)।"
আয়াতে বর্ণিত ওলীদ ইবনে মুগীরার ৯টি নিকৃষ্ট চরিত্র
মুফাসসিরগণের মতে, এই আয়াতগুলো মক্কার কাফের ওলীদ ইবনে মুগীরা-এর ব্যাপারে নাজিল হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তার ভেতরের ৯টি চারিত্রিক দোষ উন্মোচন করেছেন:
- হাল্লাফ (حَلَّافٍ): কথায় কথায় মিথ্যা কসম বা শপথকারী।
- মাহীন (مَّهِينٍ): যার কোনো আত্মমর্যাদা নেই, ব্যক্তিত্বহীন ও লাঞ্ছিত।
- হাম্মাঝ (هَمَّازٍ): সামনাসামনি বা পেছনে মানুষের নামে কুৎসা রটনাকারী ও খোঁটাখোঁটিকারী।
- মাশশায়িম বিনামীম (مَّشَّاءٍ بِنَمِيمٍ): চোগলখোর, যে সমাজে ফাসাদ সৃষ্টির জন্য একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগায়।
- মান্না'ইল লিলখাইর (مَّনاعٍ لِّلْخَيْرِ): ভালো ও কল্যাণকর কাজে নিজে তো বাধাদানকারীই, অন্যদেরও বাধা দেয়।
- মু'তাদ (مُعْتَدٍ): সীমালঙ্ঘনকারী, যে মানুষের হক নষ্ট করে ও অত্যাচার করে।
- আসীম (أَثِيمٍ): পাপিষ্ঠ, যার দিন-রাত কাটে পাপের সাগরে ডুবে থেকে।
- উতুল্ল (عُتُلِّ): নিষ্ঠুর, কর্কশ ও উগ্র স্বভাবের মানুষ, যার হৃদয়ে দয়া-মায়া নেই।
- ঝানীম (زَنِيمٍ): জারজ সন্তান বা এমন ব্যক্তি যে কোনো বংশের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও জোর করে নিজেকে সেই বংশের বলে দাবি করে।
সামাজিক বিভ্রান্তির নিরসন: "আলেমদের গালি দিলেই কি সে জারজ?"
আমাদের সমাজে অনেকে দাবি করেন, "যারা আলেম-ওলামাদের গালি দেয়, তারা আসলে জারজ সন্তান।" কিন্তু ইসলামিক শরীয়তের আলোকে এই ঢালাও দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল:
- আয়াতের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট: এই আয়াতটি ওহীর মাধ্যমে নির্দিষ্টভাবে ওলীদ ইবনে মুগীরার জন্য নাজিল হয়েছিল, যার অবৈধ জন্ম সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন।
- অপবাদের গুনাহ: ইসলামে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ (চারজন সাক্ষী) ছাড়া কাউকে জারজ বলা 'কযফ' বা অপবাদের অন্তর্ভুক্ত, যা একটি দণ্ডনীয় কবিরা গুনাহ।
আলেমদের অবমাননা করার আসল বিধান ও পরিণতি
কুরআন বা সহিহ হাদিসে আলেমদের গালিদাতাকে 'জারজ' বলা না হলেও, হক্কানি আলেমদের অবমাননা করাকে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ বলা হয়েছে:
- আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা: আলেম ও দ্বীনদার ব্যক্তিরা আল্লাহর ওলী বা বন্ধু। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, "যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির (বন্ধুর) সাথে শত্রুতা করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)
- নবীজির উম্মতভুক্ত না হওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "ওই ব্যক্তি আমার আদর্শের ওপর নাই, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আমাদের আলেমদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করে না।" (মুসনাদে আহমাদ)
- ঈমান হারানোর ঝুঁকি: কেউ যদি ইসলামের জ্ঞান (ইলম) বা আলেম হওয়ার কারণে দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষ থেকে তাকে গালি দেয় বা উপহাস করে, তবে তার ঈমান চলে যাওয়ার এবং কাফের হয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা থাকে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন